প্রথমেই আমি গত শুক্রবারে আপনাদের কোনো আর্টিকেল না দিতে পারায় ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি, তো এর আগের আর্টিকেলে আমরা আলোচনা করেছিলাম ক্লাউড কম্পিউটিং নিয়ে, আর আজ আমরা আলোচনা করবো কোয়ান্টাম কম্পিউটিং বা কোয়ান্টাম কম্পিউটার নিয়ে যতটুকু পারি সহজ কথায়, সহজ ভাবে বোঝানোর চেষ্টা করবো যদিওবা কোয়ান্টাম কম্পিউটার নিয়ে অনেক লেখাই ইন্টারনেটে পাওয়া যায়, সেগুলোর কিছু সত‍্যিই ভালো হলেও বেশিরভাগই বোধগম্য হয় না আর ভুলে ভরা থাকে এবং অবাস্তব সব দাবী করা হয়।

কোয়ান্টাম কম্পিউটার কি, কিভাবে কাজ করে, কি করতে পারে বা কি করতে পারে না এগুলো সহজ ভাষায় জানানো এই লেখার উদ্দেশ‍্য। তো আজকের এই কোয়ান্টম কম্পিউটিং সঠিকভাবে জানতে হলে বা বুঝতে হলে আমাদের কিছু  কিছু নতুন টার্ম সম্পর্কে জানতে হবে। তো চলুন প্রথমে টার্মগুলোর উপর একটু চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক ।

টার্মগুলো হলো : কিউবিট, স্পিন এবং সুপারপজিশন, এনট‍্যাঙ্গলমেন্ট এবং টেলিপোর্টেশন

কিউবিট:
আমরা যেসব কম্পিউটার ব‍্যবহার করি সেগুলো হলো ক্লাসিকাল বা সাধারন কম্পিউটার। এখানে ০,১ দিয়ে সবকিছু হিসাব করা হয়, সার্কিটে নির্দিষ্ট মাত্রার ভোল্টেজের উপস্থিতি হলো ১, অনুপস্থিতি হলো ০। তাহলে ০,১ হলো ক্লাসিকাল কম্পিউটারে তথ‍্যের একক যাকে বলা হয় ‘বিট’। কোয়ান্টাম কম্পিউটারে তথ‍্যের একক হলো ‘কিউবিট’। সেই কিউবিট একটা ইলেকট্রণ হতে পারে, একটা আলোর কণিকা বা ফোটন হতে পারে, ডায়মন্ড বা অন‍্য কিছুর অণু হতে পারে। কোয়ান্টাম মানেই হলো কোন কিছু ক্ষুদ্রতম অংশ।

স্পিন এবং সুপারপজিশন:

কোয়ান্টাম লেভেলের এই কণিকাগুলো প্রত‍্যেকেই কিছু বিচিত্র আচরণ করে। প্রতিটি কোয়ান্টাম কণার একটা স্পিন থাকে, ক্লাসিক্যাল মেকানিক্সের স্পিন বা ঘুর্ণন থেকে এটা সম্পূর্ণ আলাদা। কিন্তু যেসব কণার স্পিন মান ১/২ তাদের ক্ষেত্রে, আমরা কণাটা ডান দিকে অথবা বামদিকে ঘুরছে এরকম কল্পনা করে নিতে পারি।

আমরা বোঝার জন‍্য সাদামাটা ভাবে ধরে নিলাম ডানে ঘুরলে কিউবিটের মান ১ আর বামে ঘুরলে কিউবিটের মান ০। এখন যে কেও ভাবতেই পারে এবার আমরা কম্পিউটারে অনেকগুলো কিউবিট আলাদা করে রেখে দিবো আর তাদের স্পিন মেপে ০ বা ১ বুঝবো, হয়ে গেল কোয়ান্টাম কম্পিউটার। আবার যেহেতু কণিকাগুলো জায়গা খুব কম নেয় তাহলে একটা ছোট কোয়ান্টাম হার্ডডিস্কে মিলিয়ন মিলিয়ন কিউবিট রেখে দিবো! কিন্তু মাপামাপির ব‍্যাপারটা এত সহজ না। একটা কিউবিট বামে বা ডানে না ঘুরে দুই দিকেই একসাথে ঘুরতে পারে! তারমানে কিউবিটে ০ বা ১ নেই, আছে দুটি মানের একটা মিশ্রণ! একে বলা হয় সুপারপজিশন। যা আমরা কল্পনাও করতে পারিনা কিভাবে একটা গোলক একইসাথে বামে ও ডানে ঘুরবে, কিন্তু বাস্তবে এটাই হচ্ছে।

আরো অদ্ভূত ব‍্যাপার হলো যেই আমরা সুপারপজিশনে থাকা কণিকাটা কোন দিকে ঘুরছে দেখার চেষ্টা করবো সাথে সাথে সে যে কোনো একদিকে ঘোরা শুরু করবে, কোন দিকে ঘুরবে আগে থেকে জানার কোন উপায় নেই। ধরা যাক আমি কিউবিটটাকে দেখার চেষ্টা করলে সেটা বামে ঘোরা শুরু করলো, এরপরে আরো ১০জন দেখার চেষ্টা করলেও বামেই ঘুরবে সেটা। কিন্তু তারমানে এই নয় আমি দেখার আগেই সে বামে ঘুরছিলো, এমন হতে পারে যে আমি দেখার পর ডানে ঘুরবে। কোনদিকে ঘুরবে সেটার “প্রোবালিটি” বা “সম্ভাব‍্যতা” আমরা বের করতে পারি, কিন্তু নিশ্চিত করে বলতে পারিনা। ব‍্যাপারটা এমন না যে আমরা মুর্খ, কম জানি তাই বের করতে পারিনা, আসলে গাণিতিক সমীকরণ দিয়ে প্রমাণ করে দেয়া যায় যে আগে থেকে জানা সম্ভব না।

এনট‍্যাঙ্গলমেন্ট এবং টেলিপোর্টেশন:

আরেকটা বিচিত্র ব‍্যাপার হলো এনট‍্যাঙ্গলমেন্ট। সহজ কথায় দুটি বিষয় একটা আরেকটার উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হলে আমরা বলতে পারি বিষয় দুটি এনট‍্যাঙ্গলড হয়ে আছে। পৃথিবী আর চাঁদের গতি একটা আরেকটার অভিকর্ষ বলের উপর নির্ভরশীল। তারপরেও আমরা চঁাদের কথা উল্লেখ না করেই পৃথিবীকে অবস্থান আর গতি দিয়ে চিহ্ণিত করে ফেলতে পারি, তাই বিষয়দুটি এনট‍্যাঙ্গলড না।

এখন ধরা যাক দুটি কিউবিট আছে A এবং B নামের। তারা এনট‍্যাঙ্গলড মানে হলো একটার প্রোপার্টি আরেকটার সাথে জড়িয়ে আছে। কিউবিট A কিভাবে ঘুরছে আমরা যেই দেখার চেষ্টা করবো সাথে সাথে কিউবিট B এর স্পিন নির্দিষ্ট হয়ে যাবে। আমরা A এর স্পিন মাপার আগে দুইজনই একইসাথে বামে আর ডানে ঘুরছিলো। যেই আমরা A কে দেখলাম সাথে সাথে A যেকোন একদিকে ঘোরা শুরু করে দিলো, আর তখনই B ও একসাথে দুইদিকে ঘোরার বদলে যেকোন একদিকে ঘোরা শুরু করবে। তারমানে একটা কিউবিটকে মাপার চেষ্টা করে আমরা আরেকটির দিক নির্দিষ্ট করে দিলাম। এখানে অবাক করার মত ব‍্যাপার হলো A আর B যদি ১০০০০ আলোকবর্ষ দূরেও থাকে তাহলেও এটা ঘটবে।

এনট‍্যাঙ্গলমেন্ট ব‍্যাপারটা অবিশ্বাস‍্য হলেও কল্পনা না, বিজ্ঞানীর দুটি ল‍্যাবে বসে পরীক্ষা করে দেখেছেন সত‍্যিই এটা ঘটে থাকে। এনট‍্যা্ঙ্গলমেন্ট ব‍্যবহার করে কিউবিট “টেলিপোর্ট” করে দেয়া সম্ভব, তারমানে কণিকাটা বাতাস বা ভ‍্যাকুয়াম বা অন‍্য কোনো মাধ‍্যম দিয়ে না পাঠিয়েই জাদুর মত আরেকজায়গায় পাঠিয়ে দেয়া যায়।

তবে আইনস্টাইন বলেছিলেন আলোর গতিকে কখনো অতিক্রম করা যাবেনা, এদিকে আমি বলছি এনট‍্যাঙ্গলমেন্ট দিয়ে ১০০০০ আলোকবর্ষ কিউবিট দূরে টেলিপোর্ট করে দেয়া সম্ভব, তাহলে নিশ্চয় এটা ভূল। আসলে এনট‍্যা্ঙ্গলমেন্ট হাজার হাজার আলোকবর্ষ দূরে ঘটলেও কোন তথ‍্য চলে যায় না কারণ সবকিছু “সম্ভাব‍্যতা” অনুযায়ী হচ্ছে। টেলিপোর্ট করলে তথ‍্য পাঠানো যায়, কিন্তু সেক্ষেত্রে সেই তথ‍্য পড়ার জন‍্য কিছু সাধারণ বিট ও পাঠিয়ে দিতে হয় গন্তব‍্যে, সেটা আলোর গতি অতিক্রম করে না। তাই তথ‍্য এখানে আলোর গতি অতিক্রম করছেনা, সিনেমার মত টেলিপোর্ট করে নিমেষেই অন‍্য গ‍্যালাক্সিতে চলে যাবার আশা করে থাকলে হতাশ করতে হচ্ছে।

শুধুই গাণিতিক থিওরি?

জাদুর মত এই ব্যাপারগুলো যে শুধুই কাগজে-কলমে ঘটে না তার একটা প্রমাণ “ট্রানজিস্টর”, যার সাহায্যে কম্পিউটার, মোবাইল ফোন সহ হাজার রকমের যন্ত্রপাতি কাজ করে। কোয়ান্টাম মেকানিক্স নিয়েই গবেষণা করতে গিয়ে বিজ্ঞানিরা অনুমান করেছেন এই ধর্মগুলো ব‍্যবহার করে ট্রানজিস্টর বানানো সম্ভব, একসময় টেকনোলজীর উন্নতির পরে সেটা বানানো সম্ভবও হয়েছে। এনট‍্যাঙ্গলম‍্যান্ট, টেলিপোর্টেশন এখন ল‍্যাবে খুব নিখুতভাবে পরীক্ষা করা যায়।

কিছু প্রয়োজনীয় আর্টিকেল :

বিটকয়েন কি, কেন, কিভাবে? জেনে নিন বিটকয়েন…

ইনক্রিপশন (Encryption) কি? ইনক্রিপশন কীভা…

অল্প কথায় হ্যাকিং-এর গল্প । সাইবার দুনিয়…

কোয়ান্টাম কম্পিউটার কি?

সহজ কথায় কোয়ান্টাম কম্পিউটার হল এমন একটা কম্পিউটার যেটা কোয়ান্টাম মেকানিক্সের বিভিন্ন ধর্মকে সরাসরি কাজে লাগিয়ে সব কাজ করে। কোয়ান্টাম লেভেলের কণিকায় তথ‍্য সংরক্ষণ করা যায়, এদেরকে বলা হয় কোয়ান্টাম ইনফরমেশন। এনট‍্যাঙ্গলমেন্ট, টেলিপোর্টেশন, সুপারপজিশন ইত‍্যাদি ধর্ম ব‍্যবহার করে তথ‍্য আদান-প্রদান, হিসাব নিকাশ করা সম্ভব। কোয়ান্টাম কম্পিউটারে সব গণনা এভাবেই করা হয়। কোয়ান্টাম কম্পিউটারে এমন অনেক কাজ করা যায় যেগুলো সাধারণ কম্পিউটারে করা যায় না। যেমন পলিনমিয়াল টাইমে প্রাইম ফ‍্যাক্টরাইজেশন বা লিনিয়ার সার্চের কমপ্লিক্সিটি স্কয়ার রুট এ নামিয়ে নিয়ে আসা, রাসায়নিক বিক্রিয়া সিমুলেট করা ইত‍্যাদি।

কিন্তু এখনো  জনসাধারনের জন্যে কোয়ান্টাম কম্পিউটার ল‍্যাবে তৈরি করা যায় নি। গুগলের কেনা ডি-ওয়েভকে কোয়ান্টাম কম্পিউটার দাবী করা হলেও বেশিরভাগ বিজ্ঞানীরাই মনে করেন কোয়ান্টাম কম্পিউটার হবার সবগুলো শর্ত ডি-ওয়েভ পূরণ করে না। অনেক লেখাতে দাবী করতে দেখেছি কোয়ান্টাম কম্পিউটার গতির ঝড় তুলবে, অনেকে বলে np-complete সমস‍্যা সমাধান করতে পারবে। এসব দাবীর কতটা সত‍্যি আর কতটা কল্পনা, কি কাজে লাগবে কোয়ান্টাম কম্পিউটার, কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরির বাধা কোথায়, আসলে কোয়ান্টাম কম্পিউটার কী পারে যেটা সাধারণ কম্পিউটার পারে না? কোয়ান্টাম কম্পিউটার কি সত‍্যি ঝড়ের গতিতে সমস‍্যা সমাধান করে দিতে পারে?

কোয়ান্টাম কম্পিউটারে সব হিসাব-নিকাশ করা  হয় “কিউবিট” দিয়ে, কিউবিট হতে পারে একটা ফোটন কণিকা বা একটা ইলেক্ট্রণ বা অন‍্য কোনো কণিকা। এসব কণিকাকে ব‍্যবহার করে তথ‍্য সংরক্ষণ করা যায়, বিভিন্ন হিসাব-নিকাশ করা যায়, । বিজ্ঞানীরা যখন দেখলেন কোয়ান্টাম ইনফরমেশন ব‍্যবহার করে এমন কাজ করা সম্ভব যেটা সাধারণ কম্পিউটার দিয়ে সম্ভব না,স্বাভাবিকভাবেই তারা এই ব‍্যাপারে খুব আগ্রহী হয়ে পড়লেন। কোয়ান্টাম কম্পিউটারের গবেষণাক্ষেত্র শুরু করার কৃতিত্ব দেয়া হয় রিচার্ড ফাইনম‍্যানকে। আর আগেভাগেই জানিয়ে রাখি লেখার একটা বড় অংশ সায়েন্টিফিক অ‍্যামেরিকান ২০০৮ এ প্রকাশিত MIT’র স্কট অ‍্যারনসনের প্রবন্ধের বাকিটা  তানভীরুল ইসলামের ভাইয়ের লেখা ও শাফায়েতের ব্লগ থেকে নেওয়া !

কোয়ান্টাম কম্পিউটার সম্পর্কে বাস্তবতা হল এটা কিছু সমস‍্যা যেমন প্রাইম ফ‍্যাক্টরাইজেশন খুব দ্রুত করতে পারবে কিন্তু অন‍্য অনেক সমস‍্যা সমাধানের ক্ষেত্রে সাধারণ কম্পিউটারের থেকে ভালো পারফরমেন্স দিতে পারবে না।
ব‍্যাপারটা আরেকটু বিস্তারিত বোঝার চেষ্টা করি। একটা সমস‍্যা সমাধানের জন‍্য কম্পিউটারকে অনেকগুলো ধাপে কিছু হিসাব-নিকাশ করতে হয় যেটাকে আমরা বলি অ‍্যালগোরিদম। অ‍্যালগোরিদমের ধাপ সংখ‍্যা যত কম থাকবে তত কম হিসাব করতে হবে এবং তত দ্রুত কম্পিউটার সমস‍্যাটা সমাধান করতে পারবে। এখন ধাপ সংখ‍্যা নির্ভর করে ইনপুটের আকারের উপর। যদি ইনপুট হয় n আকারের এবং ধাপ লাগে n^2 টা তাহলে সেই অ‍্যালগোরিদমটাকে বলা হয় O(n2) অ‍্যালগোরিদম (পড়তে হবে order of n square algorithm)। O(n2) অ‍্যালগোরিদমে ইনপুটের আকার যদি হয় ১০০, তাহলে সর্বোচ্চ ১০০০০ ধাপে সমস‍্যাটা সমাধান করা যাবে। ঠিক সেরকম O(n), O(logn) অ‍্যালগোরিদম হতে পারে। এগুলোকে বলা হয় অ‍্যালগোরিদমের টাইম কমপ্লেক্সিটি, যা দেখে আমরা বুঝি কোন অ‍্যালগোরিদম দ্রুত কাজ করবে।

এখন কিছু প্রশ্ন, তোমার কাছে যদি দুটি অ‍্যালগোরিদম থাকে, একটা O(n^2) আরেকটা O(n3) তাহলে কোনটা ব‍্যবহার করলে দ্রুত সমস‍্যা সমাধান করা যাবে? যদি n টা বইয়ে মধ‍্য থেকে একটা বই খুজে বের করতে হয় তাহলে সর্বোচ্চ কয়টা বইয়ের টাইটেল তোমাকে পড়তে হবে? বই খুজে বের করার কমপ্লেক্সিটি তাহলে কত? এবার আরেকটু চিন্তা করার মত একটা প্রশ্ন, ডিকশনারিতে যদি ১০০ টা শব্দ থাকে তাহলে বুদ্ধিমানের মত খুজলে সর্বোচ্চ কয় ধাপে নির্দিষ্ট শব্দ খুজে পাওয়া যাবে? ১০০ এর জায়গায় n টা শব্দ থাকলে?

এখন n2, n3, nk এগুলো সবই হলো পলিনমিয়াল কমপ্লেক্সিটি। আরেক ধরণের কমপ্লেক্সিটি আছে যেগুলোকে বলা হয় এক্সপোনেনশিয়াল কমপ্লেক্সিটি, সেগুলো হলো kn আকারের, যেমন 2n, 3n। n এর মান যত বাড়ে অ‍্যালগোরিদমের ধাপসংখ‍্যা তত বাড়ে, পলিনমিয়াল অ‍্যালগোরিদমের ধাপ সংখ‍্যা যে হারে বাড়ে তার থেকে অনেক দ্রুত হারে বাড়ে এক্সপোনেনশিয়াল অ‍্যালগোরিদমের ধাপ। একটা গল্প মনে আছে যেখানে বাচ্চা ছেলে তার মায়ের কাছে প্রথমদিন ১টাকা, পরেরদিন ২টাকা, পরেরদিন গুলোতে ৪ টাকা, ৮ টাকা, ১৬ টাকা এভাবে করে ১ বছর টাকা চেয়েছিল? তারমানে n তম দিনে 2n টাকা দিতে হবে। নিচের টেবিলে দেখুন এভাবে বাড়াতে থাকলে ৫০ ধাপ পরেই সংখ‍্যাটা কত বড় হয়ে যায়:

n n2 n3 2n
10 100 1000 1024
15 225 3375 32768
20 400 8000 1048576
50 2500 125000 1125899906842624

ইনপুটের আকার মাত্র ৫০ হলেই 2n অ‍্যালগোরিদমের জন‍্য ধাপ সংখ‍্যা ১৬ অঙ্কের একটা সংখ‍্যা হয়ে গিয়েছে।

দু:খজনক ভাবে বাস্তবজীবনে এমন অনেক সমস‍্যা আছে যেগুলোর জন‍্য আমরা এক্সপোনেনশিয়াল অ‍্যালগোরিদমের থেকে ভালো কিছু এখন পর্যন্ত জানি না। বিজ্ঞানীরা এগুলোকে np বা non-deterministic-polynomial ক‍্যাটাগোরির সমস‍্যা বলেন। কেও যদি এই ক‍্যাটাগরির কোনো সমস‍্যার পলিনমিয়াল সমাধান বের করে দিতে পারে ১০০% নিশ্চিত ভাবে পৃথিবীর চেহারা সেই মূহুর্তে বদলে যাবে, কম্পিউটার বিজ্ঞানের “হলি গ্রেইল” বলা যেতে পারে এই সমস‍্যাটাকে। আরো ইন্টারেস্টিং ব‍্যাপার হলো, মাত্র ১টা np সমস‍্যা কেও সমাধান করতে পারলে সবগুলো np সম‍স‍্যার সমাধান হয়ে যাবে। বর্তমানে এ ধরণের সমস‍্যার ক্ষেত্রে সবধরণের সম্ভাব‍্য ফলাফল দেখে সেরাটা বেছে নেয়া হয় এবং বিভিন্ন শর্ত আরোপ করে ধাপ কিছুটা কমানো হয়।

এখন একটা সুপারকম্পিউটার হয়ত তোমার-আমার কম্পিউটারের থেকে কয়েক হাজার গুণ দ্রুত কাজ করতে পারে কিন্তু সেগুলোকেও 2100 ধাপের একটা অ‍্যালগোরিদম নিয়ে বসিয়ে দিলে গ‍্যালাক্সি আয়ু শেষ হয়ে যাবে কিন্তু সমস‍্যার সমাধান হবে না। সুপারকম্পিউটার তাই সাধারণ কম্পিউটারের থেকে দ্রুত কাজ করতে পারলেও অ‍্যালগোরিদমের কমপ্লেক্সিটি কমিয়ে আনতে পারে না। আমাদের দরকার এমন একটা কম্পিউটার যে অ‍্যালগোরিদমের ধাপ সংখ‍্যা কমিয়ে আনতে পারে। তাহলেই আমরা np ক‍্যাটাগরির সমস‍্যা দ্রুত সমাধান করে ফেলতে পারব।

এবার প্রশ্ন হলো কোয়ান্টাম কম্পিউটার কি np ক‍্যাটাগরির সমস‍্যা সমাধান করতে পারে? দু:খজনক হলেও উত্তর হলো এখন পর্যন্ত পারে না। তাই কোয়ান্টাম কম্পিউটারও এসব সমস‍্যার ক্ষেত্রে সাধারণ কম্পিউটারের থেকে ভালো করতে পারবে না।

তাহলে কোয়ান্টাম কম্পিউটার কোন সম‍স‍্যা সমাধানে ভালো কাজ করবে? সাধারণ কম্পিউটারের একটা বিট যেমন ০ বা ১ হতে পারে ঠিক সেরকম কিউবিটও ০ বা ১ হতে পারে। তবে কিউবিটের মজার ব‍্যাপার হলো সেটা একই সাথে ০ এর ১ এর মিলিত একটা অবস্থায় থাকতে পারে যাকে সুপারপজিশন বলা হয়। আমাদের কাছে ১০০০টা কিউবিট থাকলে সেখানে একই সাথে 21000 টা সংখ‍্যা ভরে রাখা সম্ভব যেটা দৃশ‍্যমান মহাবিশ্বের অণূর সংখ‍্যার থেকেও বেশি । এখন যদি আমাদের এমন একটা অ‍্যালগোরিদম থাকে যেটা একই সময়ে কিউবিটগুলোর উপর কোনো অপারেশন করে সবগুলো সংখ‍্যাকে একটা করে সম্ভাব‍্য উত্তর বানিয়ে দিবে তাহলে আমরা খুব দ্রুত সঠিক উত্তরটা খুজে বের করতে পারতাম। কিন্তু সমস‍্যা হল যখন আমরা অ‍্যালগোরিদম শেষে কিউবিটগুলোর কোন স্টেট এ আছে সেটা দেখার চেষ্টা করব তখন আমরা মাত্র ১টা স্টেট পাবো, কোয়ান্টাম মেকানিক্সের নিয়ম অনুযায়ী বাকিগুলো আমরা কিছুতেই পড়তে পারব না।

তবে ব‍্যাতিচার বা ইন্টারফেয়ারেন্স(interference) বলে একটা ব‍্যাপার আছে যেটা ব‍্যবহার করে আমরা কিছু সুবিধা পেতে পারি, প্রথমে তরঙ্গের অ‍্যামপ্লিচিউড বা বিস্তারের একটা ছবি দেখি:

এবার ইন্টারফেয়ারেন্স দেখি:

উপরের ডানের ছবিটাতে পজিটিভ আর নেগেটিভ অ‍্যামপ্লিচিউড একসাথে মিলিত হয়ে একটা আরেকটাকে বাতিল করে দিয়েছে, বামের ছবিতে একই ধরণের অ‍্যামপ্লিচিউড একসাথে হয়ে অ‍্যামপ্লিচিউড আরো বাড়িয়ে তুলেছে। আমরা যদি এমন একটা অ‍্যালগোরিদম তৈরি করতে পারি যেটা ভুল উত্তরগুলোকে ডিস্ট্রাক্টিভ ইন্টারফেয়ারেন্সের মাধ‍্যমে বাতিল করে দিবে এবং সঠিক উত্তরের অ‍্যামপ্লিচিউড বাড়িয়ে দিবে তাহলে সবার শেষের স্টেটে সঠিক উত্তর পাবার প্রোবাবিলিটি অনেক বেড়ে যাবে।

এই প্রোপার্টি ব‍্যবহার করে প্রাইম ফ‍্যাক্টরাইজেশন বা মৌলিক উৎপাদকে বিশ্লেষনের একটা অ‍্যালগোরিদম আছে যা শোর’স অ‍্যালগোরিদম(shor’s algorithm)। এই অ‍্যালগোরিদম O(n^3) ধাপে n কে কিছু প্রাইম স‍ংখ‍্যার গুণফল হিসাবে লিখতে পারে, ক্লাসিকাল কম্পিউটারে পলিনমিয়াল সময়ে কাজটা করতে পারে না (তবে এটা np ক‍্যাটাগরির কোনো সমস‍্যা না)। ক্রিপ্টোগ্রাফির অনেক প্রটোকল আছে যা সাধারণ কম্পিউটার বড় সংখ‍্যাকে দ্রুত প্রাইম ফ‍্যাক্টরাইজেশন করতে পারে না এটাকে মূলনীতি ধরে, কোয়ান্টাম কম্পিউটার এসব প্রটোকলকে খুব দ্রুত ভেঙে ফেলতে পারবে।

শুরুর দিকে একটা প্রশ্ন করেছিলাম যে n টা বই থেকে ১টা বই খুজে বের করতে সর্বোচ্চ কয়টা বইয়ের টাইটেল পড়তে হবে? উত্তর খুব সহজ, বইটা সবার শেষে থাকতে পারে তাই n বইয়েরই টাইটেল পড়া দরকার হতে পারে, কমপ্লেক্সিটি হল O(n)। ডাটাগুলো কোনো নির্দিষ্ট নিয়মে (যেমন ছোট থেকে বড়) সাজানো না থাকলে তথ‍্য খুজে বের করতে O(n) সময় লাগবে বলেই এতদিন আমরা ধরে নিয়েছি। গ্রোভার সার্চ নামের একটা কোয়ান্টাম অ‍্যালগোরিদম দিয়ে দেখানো হয়েছে O( square_root(n) ) বা n এর বর্গমূল সংখ‍্যক ধাপেই ডাটা খুজে বের করা সম্ভব যেকোন ডাটাবেস থেকে!

তবে ক্রিপ্টোগ্রাফী ভাঙাটাই কোয়ান্টাম কম্পিউটারের একমাত্র কাজ না, আরো দারুণ কিছু সম্ভাবনা আছে। কোয়ান্টাম কম্পিউটার দিয়ে আমরা রাসায়নিক বিক্রিয়া সিমুলেট করতে পারব, কোনো পরমাণু কার সাথে কিভাবে বিক্রিয়া করে সেগুলো কম্পিউটার দিয়ে বের করতে পারব। ন‍্যানোটেকনোলজি যেহেতু কোয়ান্টাম মেকানিক্সের উপর নির্ভরশীল, সেখানেও কোয়ান্টাম সিমুলেশন খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সে সময় হয়তো নতুন ঔষধের কার্যকারিতা প্রাণীর উপর পরীক্ষা না করে আমরা কম্পিউটারে সিমুলেট করে ফেলতে পারব। তবে এমআইটির স্কট অ‍্যারনসনের মতে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং নিয়ে গবেষণা করতে করতে যদি দেখা যায় যে কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরি আসলে সম্ভব না তাহলেও আমরা বিশ্বজগৎ কিভাবে কাজ করে সেটা নিয়ে নতুন অনেক ধারণা পাব।

আরো কিছু প্রয়োজনীয় আর্টিকেল :

এন্ড্রয়েড ফোন রুটিং এর সুবিধা ও অসুবিধা …

কখনও ভেবেছে কেন আপনার ফোনটি এত গরম হচ্ছে ?

ক্লাউড কম্পিউটিং কি? ক্লাউড কম্পিউটিং এর …

কোয়ান্টাম কম্পিউটার বানিয়ে ফেলতে সমস‍্যা কোথায়? প্রধান সমস‍্যা হলো কোয়ান্টাম ডিকোহেরেন্স। কিউবিটগুলো পরিবেশের সাথে ইন্টার‍্যাকশনের কারণে সে যে স্টেট এ ছিল সেটা নষ্ট হয়ে যায়, পদার্থবিজ্ঞানীরা যাকে বলেন “ওয়েভ ফাংশন কলাপস” করে। আমরা জানি কিউবিট একই সাথে একাধিক স্টেট এ সুপারপজিশন অবস্থায় থাকতে পারে, ডিকোহেরেন্স এর ফলে একটা মাত্র স্টেট এ “কলাপস” করে। এবং একবার “কলাপস” করলে সেটাকে আর আগের অবস্থায় ফেরত নেয়া যায় না। কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরির বাধাগুলোর মধ‍্যে এটাই সবথেকে বড়। তবে বিজ্ঞানীরাও থেমে নেই কোয়ান্টাম কম্পিউটার নিয়ে এখন বিস্তর গবেষণা চলছে। থিওরি এবং ব্যবহারিক দুইদিক নিয়ে বিভিন্ন রিসার্চ এজেন্সি এবং ইউনিভার্সিটি কাজ করে যাচ্ছে।

সম্প্রতি সাসেক্স ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীদের মতে তারা কোয়ান্টাম কম্পিউটার নির্মাণের কাছাকাছি চলে এসেছেন। এই কোয়ান্টাম কম্পিউটার পূর্বের সব সুপার কম্পিউটার থেকে এক ধাপ এগিয়ে থাকবে বলে দাবী করছে বিজ্ঞানীরা। পদার্থ বিজ্ঞানের কোয়ান্টাম সূত্র থেকে মূলত কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরি করছে বিজ্ঞানীরা।

এছাড়া, বোসন স্যাম্পলিং মেশিন নামে এক কোয়ান্টাম কম্পিউটার নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে চীনের এক কোম্পানি। কুড়ির দশকের মাঝামাঝিতে যে আধুনিক ইলেক্ট্রনিক ও ট্রানজিস্টার কম্পিউটারের জন্ম কোয়ান্টাম কম্পিউটার সেগুলোর তুলনায় ১০ থেকে একশ গুণ বেশি গতির বলে দাবি এ কোম্পানির।

আবার এদিকে, সম্প্রতি জাপানিরা নিজেদের প্রথম সুপার ফাস্ট কোয়ান্টাম কম্পিউটারের উদ্বোধন করেছে।উদ্বোধন হওয়া সংস্করণটি প্রচলিত যে কোনো সুপার কম্পিউটারের চেয়ে ১০০ গুণ দ্রুতগতিতে গাণিতিক হিসাব সমাধান করতে পারছে। আর এ জন্য কম্পিউটারটি মাত্র এক কিলোওয়াট শক্তি খরচ করছে। যেখানে সুপার কম্পিউটার অনেক বেশি শক্তি খরচ করে।কম্পিউটারটি উদ্বোধন করে এর সৃষ্টিকারী জাপানের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন (এনটিটি) এবং টোকিও ইউনিভার্সিটি। নির্মাতা দুই প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, কম্পিউটারের জন্য ক্লাউড সিস্টেমে কোয়ান্টাম নিউরাল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হচ্ছে।

 

শেষ কথা

বিশ্বের ১৮টি কোম্পানি কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরি পরিকল্পনা নিয়েছে। যার মধ্যে, গুগল, মাইক্রোসফট, অ্যায়ারবাস, আলিবাবার মতো বড় কোম্পানিগুলো রয়েছে। হয়তো কয়েক বছর পরেই আমরা শুনতে পাবো কোম্পানিগুলোর কেউ তেরী করে ফেলেছে কোয়ান্টম ডেস্কটপ যা ধিরে ধিরে হয়ে যাবে আমাদের আজকের ডেস্কটপ বা লেপটপের মতো দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গী । আশা করি কোয়ান্টাম কম্পিউটার নিয়ে আজকের এই আর্টিকেলটি আপনাদের ভালো লেগেছে তবে কোথাও কিছু জানার থাকলে বা জানানোর থাকলে অবশ্যই কমেন্টস করবেন, আর হ্যাঁ আর্টিকেলটি শেয়ার করতে ভূলবেন না ।

0 Comments

Leave a reply

CONTACT US

We're not around right now. But you can send us an email and we'll get back to you, asap.

Sending
©2012 - 2020 Techwave.Asia All Rights Reserved.
or

Log in with your credentials

Forgot your details?